বিশেষ প্রতিনিধি
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাঁচ সমন্বয়ক শনিবার রাজধানীর গুলশান এলাকায় আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদাবাজি করতে গিয়ে পুলিশর হাতে আটক হয়েছে। ফলে প্রশ্নের সম্মুখিন হচেছ
ছাত্রদের করা তিন সংগঠন।
চাঁদা দাবির অভিযোগে আটককৃতরা হলেন, ইব্রাহিম হোসেন মুন্না, মো. সাকাদাউন সিয়াম, সাদাব, আমিনুল ইসলাম এবং আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান রিয়াদ। তারা শাম্মি আহমেদের বাসায় গিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিলেন এবং দশ লাখ টাকা গ্রহণ করেছিলেন বলে পুলিশ বলছে। বাকি টাকা আনতে গিয়েই তারা শনিবার পুলিশের হাতে আটক হন।

পুলিশ তাদেরকে রোববার আদালতে সোপদ্দ করলে মাননীয় আদালত তাদের প্রত্যেকের ৭ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এই ঘটনার পর তাদের সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়া সকল কমিটি বাতিল করেছে শেখ হাসিনাকে বিতারিত করা মাস্টার মাইন্ড এই সংগঠনটি।
সমন্বয়ক পরিচয়ে একেকজন একেক জায়গায় দখল করেছে। সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদাবাজি ও দখল করছে। জুলাই কেন ‘মানি মেকিং মেশিন’ হবে মন্তব্য করেছেন উমামা ফাতেমা নামক এক সমন্বয়ক। সম্প্রতি তিনি সংগঠন থেকে পদত্যাগও করেছেন। তার বক্তব্য ”আমি মুখপাত্র হওয়ার পর আবিষ্কার করছি, এটা দিয়ে অনেকে অনেক কিছু করছে। টেন্ডার-তদবির বাণিজ্য করছে, ডিসি নিয়োগ বানিজ্য করছে। এগুলো অহরহ চলছে। এর আগে এটা নিয়ে ধারণা ছিল না। জুলাই আন্দোলনকে কেন মানি মেকিং মেশিন করব? আনফরচুনেটলি সেটা হয়েছে। অনেকে কয়েক শ কোটি টাকা লুটে নিয়েছে এই কয়েক মাসে”।
ঢাকা শহরে সমন্বয়ক ও সমন্বয়ক নামধারী কিছু চাঁদাবাজ সুযোগসন্ধানী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ। তিনি বলেন, ”বনানীর ঘটনাটি হয়তো এখন সম্মুখে এসেছে। কিন্তু ঢাকার উত্তরার ঘটনাগুলো সম্মুখে আসছেনা। ওই এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নোমান এসএম প্লাজা নামক একটি ভবনে রীতিমত চাঁদাবাজির অফিস খুলে বসেছে। দখলবাজি, চাঁদাবাজি, অবৈধ উচেছদ একর পর এক ঘটিয়ে চলেছে। অবৈধ ভাবে উচেছদ করেছে ৭ নম্বর কল্যান সমিতির বৈধ নির্বাচিত কমিটি। এখন কমিটি তাঁর নিয়ন্ত্রনে। ৭ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথ রোডের ৫৯ নম্বর বাড়ি থেকে অবৈধভাবে উচেছদ করা হয়েছে এক সাংবাদিককে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার লোক ও ভারতের দালাল আখ্যা দিয়ে তাঁকে জোরপুর্বক উচেছদ করা হয় যার নেতৃত্ব ও মাস্টার মাইন্ড ছিল নোমান ও ”ওবায়দুর মামা” নামক এক চাঁদাবাজ। ওই সাংবাদিক উত্তরা পশ্চিম থানায় পর পর দুইটা জিডি করেছিলেন এই ঘটনায়। কিন্তু পুলিশ তাঁকে কোনো সহযোগিতা করেনি”। এই শিক্ষক বলেন, সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে শুধু রাজধানী ঢাকা শহরই নয় জেগে উঠছে বাংলাদেশের মানুষ। তিনি বলেন, ”যে লক্ষ্য নিয়ে যে বৈষম্যের কারণে শেখ হাসিনাকে তারা বিতারিত করলো একই বৈষম্য সমন্বয়করা শুরু করেছে। রাজধানীর বনানীর ঘটনাটিই তাঁর জলন্ত উদাহরণ”।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)র কয়েক জন নেতা গত কয়েকমাসে নানা ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন। যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে গত এপ্রিলে দল থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ঢাকার ধানমণ্ডির একটি বাড়িতে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে মব হামলার পর আটককৃতদের থানা থেকে ছাড়িয়ে এনে আলোচনায় এসেছিলেন এনসিপির আরেকজন নেতা আব্দুল হান্নান মাসুদ। তাকেও গত মে মাসে ওই ঘটনার পর দল থেকে শোকজ করা হয়েছিলো।
এর আগে গত বছর আগস্টের পর থেকে সারাদেশেই সমন্বয়ক পরিচয়ে ক্ষমতা প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, তদবিরসহ নানা অভিযোগ আসতে থাকে।
গত বছর সেপ্টেম্বরে সাভারে সমন্বয়ক পরিচয়ধারী এক যুবককে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দের পর মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি দলবল নিয়ে একটি বাড়িতে তল্লাশির জন্য গিয়ে চাঁদা দাবি করেছিলেন।
গত বছর ডিসেম্বরের প্রতারণা, চাঁদাবাজি ও মানহানির অভিযোগে করা এক মামলায় ফেনীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কথিত সমন্বয়ককে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষের কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন।
এই প্লাটফর্মের রংপুরের এক নেতার গত মার্চ মাসে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবির ভিডিও এবং অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁস হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে খুলনা নগরীতে একটি বাড়িতে ঢুকে গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবি ও সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে চার শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে জনতা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির অনেকেই চাঁদাবাজি, দখল দারিত্ব, ঘুস বাণিজ্য সহ এ ধরনের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, তাদের করা তিনটি সংগঠন যেমন, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, এনসিপি ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ দেশের জনগনের কাছে প্রশ্নের সম্মুখিন।
তিনি বলছেন, সাংগঠনিক ব্যবস্থার প্রভাব দৃশ্যমান নয়। পূর্ব বোঝাপড়া করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিলে তা কোনো পরিবর্তনও আনবে না। কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিলে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ প্রবণতা বাড়বে।
তার মতে, যেসব অভিযোগ আসছে বা লোকমুখে যা শোনা যাচ্ছে – তার বেশিরভাগ নিয়েই শক্ত অবস্থান দেখা যায় না। ফলে মুখে যাই বলুক এর পেছনে বা ভেতরে দুর্বৃত্তায়নের সুযোগ কেউ কেউ নিচ্ছেন বলে মনে করেন তিনি।
Reporter Name 









